তার ভাষায়, খামারে মুরগি আছে, উৎপাদনও হচ্ছে; কিন্তু ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, তাতে কাঙ্ক্ষিত লাভ থাকছে না। কখনোসখনো গুনতে হয় উল্টো লোকসান।
সম্প্রতি তার খামারে গিয়ে দেখা যায়, গরমে হাঁসফাঁস চারপাশ। খামারের ভেতরেও নেই স্বস্তি। বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ রয়েছে ফ্যান। গরমে ছটফট করছে হাজার হাজার মুরগি। কিছুক্ষণ পরপর জেনারেটর চালিয়ে ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন আব্দুল মালেক। বিদ্যুৎ ফিরলে জেনারেটর বন্ধ হচ্ছে, আবার লোডশেডিং শুরু হলে সেটি চালু করতে হচ্ছে। এভাবেই কাটছে দিনের পর দিন।
জানতে চাইলে আব্দুল মালেক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার পাঁচটা খামার ছিল। ২০০০ সাল থেকে খামার ব্যবসার সঙ্গে আছি। ক্রমান্বয়ে লোকসানে চলতি বছর দুটি বন্ধ করে দিয়েছি। বিদ্যুৎ বিল, ফিডের উচ্চ মূল্য, জেনারেটর ও শ্রমিক ব্যয় বেশি। প্রতিটি খামারে মাসে গড়ে ৯ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু সে খরচ উঠে আসছে না। এভাবে উৎপাদনে উচ্চ ব্যয় ও মুনাফা না থাকায় অনেকেই পেশা বদলাচ্ছেন।’
এ খামারির হিসাব অনুযায়ী, গত শনিবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল মাত্র ৭-৮ ঘণ্টার মতো। গতকাল সন্ধ্যায় কথা বলার সময়ও তার এলাকায় চলছিল লোডশেডিং। ফলে মুরগির খামারে বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক রাখতে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে তিনটি খামার চালাতে প্রতিদিন গড়ে ২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এতে শুধু জেনারেটরের জ্বালানি বাবদ মাসে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে তার। অথচ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেই যদি খামার পরিচালনা করা যেত, তাহলে আরো অনেক খরচ কম লাগত।
কেবল জেনারেটর নয়, বিদ্যুৎ বিলও এখন খামারিদের জন্য বড় ব্যয়ের খাত। আব্দুল মালেকের তিনটি খামারে গত দুই মাসে, অর্থাৎ জুন ও জুলাইয়ে বিদ্যুৎ বিল এসেছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অথচ বিদ্যুতের দাম বাড়ার আগে তার মাসিক বিল ছিল গড়ে ১০-১২ হাজার টাকার মতো। অর্থাৎ একদিকে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় সে ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে ডিজেল দিয়ে। এতে উৎপাদন খরচের ওপর পড়ছে দ্বিমুখী চাপ।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দৈনিক কমপক্ষে ৫-৬ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে। এতে বিপাকে পড়েছেন সেখানকার খামারিরাও। উপজেলায় ৩১টি লেয়ার ও এক হাজারেরও বেশি ব্রয়লার মুরগির খামারি রয়েছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ধরে রাখতে তারা জেনারেটর ব্যবহার করছেন। এতে খরচ বেড়েছে, যা গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর। বর্তমানে সেখানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ২০০-২২০ টাকায়। লেয়ার বিক্রি হচ্ছে ৩৫০-৩৮০ টাকা কেজি।
মিরসরাই উপজেলা পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও ‘বাপ্পি পোলট্রি ফার্ম’-এর স্বত্বাধিকারী জহেদ হোসেন বাপ্পি বলেন, ‘মিরসরাই ও ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলায় আমার ১৫টি খামার রয়েছে। সেসব খামারে ব্রয়লার ও সোনালি মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার মুরগি। লোডশেডিংয়ের কারণে খামারগুলোয় জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ অনেকটা বেড়েছে।’
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্যমতে, গত শনিবার সন্ধ্যার পিক আওয়ারে (৭টা) দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় ২ হাজার ৬৫৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। সবচেয়ে বেশি ৫৩৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল ঢাকা জোনে। এরপর ৪৮৬ মেগাওয়াট ছিল ময়মনসিংহ জোনে। আগের দিন শুক্রবার একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫৮ মেগাওয়াট। বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৪২ মেগাওয়াট। একইভাবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পিক আওয়ারে সারা দেশে চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট। ওই সময় ১ হাজার ৪০৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।
এদিকে যশোরের অভয়নগরে টানা ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় গত শনিবার একটি পোলট্রি খামারের চার শতাধিক মুরগি মারা গেছে বলে জানিয়েছেন সেটির উদ্যোক্তা ও যমজ ভাই মো. হাসান ও মো. হোসেন। এতে তাদের ৩ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তারা। উদ্যোক্তারা জানান, তাদের খামারে আড়াই হাজারের মতো মুরগি ছিল। শুক্রবার রাত ১২টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ৮ ঘণ্টা পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। এ সময়ের মধ্যে বিক্রির উপযোগী চার শতাধিক মুরগি মারা যায়।
মো. হাসান বলেন, ‘আমরা ধারদেনা করে দুই ভাই খামারটি করেছি। বাবা-মাকে নিয়ে সারা দিন দেখাশোনা করি। মুরগি বিক্রির সময় হয়েছিল। ভেবেছিলাম বিক্রি করে সব দেনা পরিশোধ করব। কিন্তু বিদ্যুতের কারণে সব শেষ হয়ে গেল।’
নওয়াপাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর ডিজিএম সনজিৎ কুমার মণ্ডল জানিয়েছেন, গ্রামের বিদ্যুতের তারের ওপর শুক্রবার রাতে গাছ পড়ে। এতে একটি তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক রাতের ঘটনা হওয়ায় তারা কিছুই করতে পারেননি।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) দাবি, ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, ভ্যাকসিন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহনসহ প্রতিটি উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। এতে খামারিদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু এ বৃদ্ধির সঙ্গে মুরগি ও ডিমের খামার পর্যায়ে বাজারমূল্যের কোনো সামঞ্জস্য নেই। ফলে প্রান্তিক খামারিরা প্রতিনিয়ত লোকসানের বোঝা টানছেন। অনেকেই তাই পেশা ছাড়ছেন।
২০২০ সালের আগে দেশে প্রায় দুই লাখ পোলট্রি খামারি ছিলেন। কিন্তু ধারাবাহিক লোকসান, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারমূল্যের অস্থিতিশীলতা, সহজ শর্তে অর্থায়নের অভাব এবং বিভিন্ন ধরনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কারণে বর্তমানে খামারের সংখ্যা কমে ১ লাখ ৩৬ হাজারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রায় ৬৪ হাজার খামারি এ খাত থেকে ঝরে পড়েছেন।
বিপিআইএর যুগ্ম মহাসচিব আলমগীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুই বছর ধরে টানা লোকসানে রয়েছেন ডিম উৎপাদনকারী পোলট্রি খামারিরা। লোডশেডিং এ খরচের তালিকা আরো বড় করেছে। আগে যে খামারির মাসে ২ হাজার টাকা জেনারেটরের পেছনে ব্যয় হতো, এখন দেখা যাচ্ছে তার ২০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। গ্রামে একেবারেই বিদ্যুৎ থাকে না। এখানে কোনোদিনই রাষ্ট্রীয় তদারকি ছিল না, এখনো নেই। কেউই এসব দেখে না। খামারিরা শুধু আর্থিকভাবেই নয়, সামাজিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’ বর্তমানে ডিমের দাম বাড়লেও খামারিরা প্রতি পিস ৯ টাকায় বিক্রি করছেন বলে দাবি এ নেতার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ণবয়স্ক ব্রয়লার মুরগি ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরের তাপমাত্রায় অস্বস্তিতে ভোগে। সে জন্য মুরগিকে ঠাণ্ডা পরিবেশ দিতে হয়। গরমের তীব্রতা বাড়লে মুরগির খাদ্যগ্রহণ কমে যায়। এতে মাংস উৎপাদনে প্রভাব পড়ে। আবার তাপমাত্রা বেশি হলে হিট স্ট্রোকে মারা যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। এতে খামারির ব্যয় ও লোকসান দুটিই বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী সম্প্রতি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্রয়লার মুরগি বেশি গরম সহ্য করতে পারে না। হিট স্ট্রোক থেকে মুরগিকে বাঁচাতে ঘর ঠান্ডা রাখতেই হবে। সেজন্য ফ্যান চালানো জরুরি। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। এতে খরচও বেড়ে যায়।’
বিকল্প জানিয়ে ড. মো. শওকত আলী বলেন, ‘প্রয়োজন হলে ঘরের চালে কিছুক্ষণ পরপর পানি ছিটানো কিংবা পাটের চট দিয়ে ঢেকে রাখা যেতে পারে। এতে ঘর গরম কম হবে। এছাড়া মুরগির খাবারের পানির সঙ্গে লেবুর রস ও গ্লুকোজ মিশিয়ে দেয়া যেতে পারে।’
পোলট্রি খামারিরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারেও পড়তে পারে। বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের কারণে খামারিরা টিকে থাকতে না পারলে বাজারে মুরগি ও ডিমের সরবরাহ কমার ঝুঁকি তৈরি হবে।
সার্বিক বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পোলট্রি খামারের বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারকদের জানানো হয়েছে। তারা বিষয়টি নিয়ে আন্তরিক। কোনো সংকট হবে না।’
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন যশোর, টাঙ্গাইল ও চট্টগ্রামের মিরসরাই প্রতিনিধি)